সালাম-ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য ll রিজওয়ানুল ইসলাম
সালাম-ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য
-রিজওয়ানুল ইসলাম
বিকেল বেলা। আমরা পাড়ার কয়েকজন বন্ধু আর বড় ভাইয়ারা মিলে আসরের নামাজ শেষে
বসে গল্প করছি। গল্প করতে করতে কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখলাম নাহইয়ান ভাইয়া কাধে
একটা বিশাল স্কুল ব্যাগ আর হাতে একটা মাঝারি সাইজের লাগেজ নিয়ে আসছেন।
নাহইয়ান ভাইয়া আমাদের পাড়ায় একটা মেসে থাকেনাঈদের ছুটিতে বাসায় গিয়েছিলেন।
নাহইয়ান ভাইয়া তার ইসলামিক আলােচনা, ইসলামি গল্প বলার জন্য বেশ বিখ্যাত। তার
আলােচনায় ড. জাকির নায়েকের মতাে উদ্ধৃতি, মিজানুর রহমান আজহারীর মতাে সুন্দর
কথার ফুলঝুরি আর নুমান আলী খানের মতাে ব্যাখার অসাধারণ মিশ্রণ। তাকে নিয়ে
আরেকদিন বলব।
এসেই তিনি আমাদেরকে মুচকি হেসে একটা সালাম দিলেন- “আসসালামু আলাইকুম
ওয়ারহমাতুল্লাহ”।
আমরা সবাই সালামের উত্তর দিলাম। তারপর কিছুক্ষণ কুশল বিনিময় হলাে। কুশল বিনিময়
শেষে আবদুল্লাহ ভাইয়া বলে উঠল- “ভাই, ছােট্ট করে কোনাে বিষয়ে একটা আলােচনা
নাহইয়ান ভাইয়া মুচকি হেসে বলল- আচ্ছা, এই ঝােলাগুলাে রুমে রেখে আসি'।
আমরা বললাম- আচ্ছা।
১৫-১৬ মিনিটের মধ্যেই নাহইয়ান ভাইয়া রুম থেকে ফিরে আসলেন। এসে আবার সালাম
দিলেন।
আমরা একটু ইতস্তত করলেও আবার সালামের উত্তর দিলাম। আমি ভাবলাম-১৫ মিনিট
আগেই তাে দেখা হল, তখন তাে সালাম দিয়েছিলেন, এখন আবার! কয়বার সালাম দিতে
ভাবা বাদ দিয়ে সবার আগে আমিই জিজ্ঞেস করলাম – কি নিয়ে আলােচনা করবেন
ভাইয়া?
--২৫-২৬ মিনিটের মাথায় তাে মাগরিবের আজান দিয়ে দিবে। সময় বেশি নেই। আজ সালাম
নিয়ে ছােট্ট একটা আলােচনা করি।
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
নাহইয়ান ভাইয়া তার প্রিয় চরিত্র ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ সিরিজের সাজিদের মতাে একবার
গলা খাকারি দিয়ে শুরু করলেন- ‘সালাম আরবি শব্দ এর অর্থ শান্তি। ইসলাম শব্দের মূল
অর্থ হলাে আত্মসমর্পণ করা। অনেকে মনে করেন ইসলাম শব্দট সালাম/সিলমুন শব্দ থেকে
এসেছে যার অর্থ শান্তি। আবার আল্লাহ তায়ালার সুন্দর নামসমূহের মধ্যে একটা সালাম-
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তাে মুখস্ত সবার, ওখানেই আছে। জান্নাতের নামসমূহের
মধ্যে একটা হচ্ছে সালাম । আদম (আ.)কে সৃষ্টির পর আল্লাহ তাকে ফিরিশতাদের সালাম
দিতে আদেশ করেন- মিশকাত ৪৬২৮। এটা খুব সুন্দর একটা অভিবাদন, দোয়া, অপর
মুসলিমের জন্য চাওয়া। এর মাধ্যমে আমরা একে অন্যের জন্য দোয়া করি, আল্লাহর শান্তি
কামনা করি। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ'।
নাহইয়ান ভাইয়ার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনছি আমরা।
-“সহীহ মুসলিমের ৫৪৮৮ নম্বর হাদিস- সালাম এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের
হক। সালাম দেয়া সুন্নাহ তবে এর উত্তর দেওয়া ওয়াজিব, ফরজের কাছাকাছি। অথচ আমরা
এই সুন্নাহ ভুলেই গেছি। আমরা সালাম দেয়াটা প্রয়ােজনীয় মনে করি না। এমনকি সালাম
দেয়াটা অনেকে আন স্মার্টনেস মনে করি, সালাম দিতে লজ্জাবােধ করি,নিজেকে ছােট মনে
করি।ভাবি ছােটদের কেমনে সালাম দিব, বন্ধুদের আবার সালাম দেওয়া যায় নাকি! সালাম
দিলে তাে ওরা হাসাহাসি করবে। অথচ নাবীজি (স) বারবার সালাম দিতে তাগিদ দিয়েছেন,
সালাম ছড়িয়ে দিতে বলেছেন। সালামের মাধ্যমেই তাে শান্তি ছড়িয়ে পড়বে।
নাবীজি (স) বলেছেন, তােমরা সালামের বহুল প্রসার করাে, তাহলে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ
করবে। এটা আছে আদাবুল মুফরাদে-৯৮৮নম্বর হাদিস।
সালামের গুরুত্বটা কত দেখ- হাদিসটা বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা (রাঃ)। নবী (সাঃ)
বলেন- “তােমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। তােমরা
পরস্পরকে মহব্বত না করা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তােমাদের এমন
জিনিস জ্ঞাত করবাে নাসাঈ, যাতে তােমাদের পরস্পরের মধ্যে মহব্বত সৃষ্টি হয়? সাহাবাগণ
বলেন, নিশ্চয় ইয়া রাসূলাল্লাহ(স)! তিনি বলেন, তােমাদের মধ্যে সালামের বহুল প্রসার
ঘটাও। [আদাবুল মুফরাদ-৯৮৯]
তারপর দেখ-জনৈক এক ব্যক্তি বললাে, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! ইসলামে কোন জিনিসটা
সর্বোত্তম? তিনি বললেন- তুমি লােহকদেরকে আহার করাবে এবং সালাম দিবে পরিচিত-
অপরিচিত সকলকে-[সহীহ বুখারী ১২]
আবার সালাম দিলে অনেকেই সালামের উত্তর দেই না। অহংকারের শেষ নাই গাে বুঝছাে।
উত্তর দেওয়া কিন্তু ওয়াজিব। আবার অনেকে মাথার ইশারায় উত্তর দেই মাথা বুকায়। এটা
কিন্তু সুন্নাহ না।
কেউ আবার ভাবি, ধুর মিয়া আমি কেন সালাম দিতে যাব,ও আগে দেক। অথচ দেখ-
নাবীজি(স) বলছেন- দুইজন পদচারী একত্র হলে তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দেয় সে
অধিক উত্তম'। -[আদাবুল মুফরাদ -১০০৩]
নাবীজি(স) ,সাহাবা (রা) আজমাইন তাদের সালাম দেওয়ার অভ্যাসটা দেখ। তাদের সামনে
কোন গাছ প্রতিবন্ধক হওয়ায় কেউ তার ডান পাশ দিয়ে এবং কেউ বাম পাশ দিয়ে যেতে
তাদের পুনরায় সাক্ষাৎ হতেই পরস্পর সালাম করতেন।
আমরা নাহইয়ান ভাইয়ার কথায় ডুবে গেছি একেকটা হাদিস বা ঘটনা একেকভাবে
আমাদের বিস্মিত করছে। এখন বুঝলাম এই জন্যই তিনি রুম থেকে এসে আবার সালাম
দিয়েছিলেন।
-নাবীজি(স) মদীনায় প্রবেশ করেই প্রথমে বললেন – “তােমরা সালামের প্রসার ঘটাবে,
লােকদের খাদ্য দিবে, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকবে (শেষ রাতে) তখন (তাহাজ্জুদের) সালাত
আদায় করবে। তাহেল তােমরা শান্তি ও নিরাপদে জান্নাতে দাখেল হতে পারবে'।
[তিরমিযি ২৪৮৭, ইবনু মাজাহ ১৩৩৪]।
দেখ নাবীজি(স) এর উপদেশ গুলাের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটানাের কথা বলেছেন। তিনি
লােকদের সালাম দিতে বলতেন।
কারাে সাথে সাক্ষাৎ শেষে কিংবা কোনাে মিটিং শেষেও সালাম দিয়ে বের হতে হবে বা
আস্তে হবে কারণ পরের সালাম আগের সালামের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিরমিজি,
নাসায়ীসহ আরাে কয়েকজায়গায় এটা রয়েছে। -(আদাবুল মুফরাদ ১০১৮)
সালাম দেওয়ার একটা সুন্দর সিস্টেম আছে। শােনাে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন-
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,“আরােহী পদচারীকে, পদচারী উপবিষ্ট ব্যক্তিকে এবং কম সংখ্যক
বেশী সংখ্যককে সালাম দিবে।-[বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী]
একটা ট্রেন্ড আছে -আমরা হাত তুলে ইঙ্গিতে সালাম দেই অনেকে,এটাও সুন্নাহ পরপন্থি।
সাহাবা (রা) আজমাইন এটা অপছন্দ করতেন। এটা আছে আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে, হাদিস
নম্বর ১০১৪।
তারপর দেখবা-সালামের নামে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি প্রণাম/কদমবুসি চালু আছে।
আমার এক বন্ধু সাকিব বলল – “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি দেখেছি এটা। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-বউ
কয়েক জনকে পা ছুয়ে সালাম করছিল। টিভিতে তাে ব্যাপক দেখা যায়'।
নাহইয়ান ভাইয়া বললেন- “হ্যা এটা চরম ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা পুরােপুরি
নাজায়েজ। এর কোনাে কিছুর দলিলই নেই'।
মিসবাহ ভাইয়া বলল- “নাহইয়ান ভাইয়া পানি আনব? আপনার গলা শুকিয়ে গেছে মনে
-“থাক ভাইয়া, বাদ দাও আর মাগরিব হতে আর সময় নেই। নামাজ পড়ে রুমে গিয়েই খাব।
-আচ্ছা ভাইয়া শুরু করেন'।
নাহইয়ান ভাইয়া শুরু করলেন -“বড় করে অর্থাৎ দীর্ঘ করে সালাম দিলে কিন্তু নেকি বেশি
হয়। হাদিসটা মনে আসছে না, দেখে বলি'। তারপর তিনি মােবাইল বের করে Al-Hadith
অ্যাপ বের করে বললেন- এটা আবু দাউদের ৫১০৫ নম্বর হাদিস- ইমরান ইবন হুসায়ন
(রা.) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- একদা এক ব্যক্তি নবীজি(স)এর কাছে এসে বলল
আসসালামু আলাইকুম। নবীজি(স)তার সালামের জবাব দিলে সে ব্যক্তি বসে পড়ে। তখন
নবীজি(স)বলেন- সে দশটি নেকী পেয়েছে। এরপর একব্যক্তি এসে বলল- আসসালামু
আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। তিনি তার সালামের জবাব দিলে সে ব্যক্তি বসে পড়ে। তখন
নবীজি(স)বলেনঃ সে বিশটি নেকী পেয়েছে। এরপর একব্যক্তি এসে বলে- আসসালামু
আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। নবীজি(স)তার সালামের জবাব দিলে সে বসে
পড়ে। তখন তিনি বলেন-সে ত্রিশটি নেকী পেয়েছে'।
আর সালামের উত্তর দেওয়ার সময় একটা বেশি যােগ করে বলবা-দেওয়ার সময় বেশি
বললে যেমন নেকি বেশি উত্তর দেওয়ার বেলায়ও একি। আর যাকে উত্তর দিবা সেও খুশি
হবে।
তাহলে যা বুঝলাম –
★সালামের গুরুত্ব কিন্তু ব্যাপক। সালামের বহুল প্রসার করতে হবে।
★আর আগে সালাম দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে হােক না সে বয়সে ছােট কিংবা পদমর্যাদায়। কেননা আগে যে সালাম দিবে সে উত্তম এবং সে অহংকারমুক্ত হয়।
★তারপর ঘরে ঢুকামাত্রই সালাম দিতে হবে আর চেষ্টা করতে হবে বড় করে সালাম দেওয়ার যাতে বেশি নেকির অধিকারী হতে পারি।
★আর একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা- ফোনে কথা বলার সময় হ্যালাে-ট্যালাে বাদ দিয়ে সালাম দিতে হবে।
সালাম দেওয়ার সময় অনুভব করবা-তুমি কারাে শান্তি চাচ্ছাে,কেউ যখন উত্তর দিবে তখন
অনুভূতিটা আরও মজার। সেও তােমার শান্তি চাচ্ছে, তােমার জন্য আল্লাহর রহমত চাচ্ছে
সে'।শেষ করলেন নাহইয়ান ভাইয়া।।
কথাগুলাে অনুভব করছিলাম যেন। সত্যিই তাে আমরা যান্ত্রিকভাবে সালাম দিয়ে কাজ
সারি। আহা অনুভবটা যে কি প্রশান্তির, এটা ভাবিই না।
ভাবতে ভাবতেই মাগরিবের সুমধুর আজান ভেসে আসল কানে। আমরা সবাই মাসজিদের
উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম।
সমাপ্ত
লেখক সম্পর্কে কিছু কথা:
রিজওয়ানুল ইসলাম হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। ভালো লাগে বই পড়তে আর লিখতে, লেখনীর মাধ্যমের সকল অন্ধকার দূর করে সমাজকে কুরআনের আলোতে আলোকিত করতে করতে চাওয়া এক কিশোর।


No comments